উইকিবই
bnwikibooks
https://bn.wikibooks.org/wiki/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8_%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BE
MediaWiki 1.47.0-wmf.18
first-letter
মিডিয়া
বিশেষ
আলাপ
ব্যবহারকারী
ব্যবহারকারী আলাপ
উইকিবই
উইকিবই আলোচনা
চিত্র
চিত্র আলোচনা
মিডিয়াউইকি
মিডিয়াউইকি আলোচনা
টেমপ্লেট
টেমপ্লেট আলোচনা
সাহায্য
সাহায্য আলোচনা
বিষয়শ্রেণী
বিষয়শ্রেণী আলোচনা
উইকিশৈশব
উইকিশৈশব আলাপ
বিষয়
বিষয় আলাপ
রন্ধনপ্রণালী
রন্ধনপ্রণালী আলোচনা
TimedText
TimedText talk
মডিউল
মডিউল আলাপ
ইভেন্ট
ইভেন্ট আলোচনা
বিশ্বের ইতিহাস/রোমান সাম্রাজ্য
0
29430
107243
104241
2026-09-07T20:00:46Z
~2026-48577-87
13889
qaawssasqqwa;,k,tukj,
107243
wikitext
text/x-wiki
==প্রাচীন রোম এবং প্রজাতন্ত্র==
===একটি সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর===
[[File:Capitoline she-wolf Musei Capitolini MC1181.jpg|thumb|রোমুলাস ও রেমাস এবং ক্যাপিটোলিন উলফের ভাস্কর্য, যা রোম প্রতিষ্ঠার অন্যতম একটি লোককাহিনি।]]
সাহিত্য বা কিংবদন্তি অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দে রোমুলাস ও রেমাস নামের যমজ ভাই রোম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা যথাক্রমে প্যালাটাইন এবং অ্যাভেন্টাইন পাহাড়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। (উল্লেখ্য, রোম শহরটি সাতটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত।) রেমাস তাঁর ভাই রোমুলাসের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। রোমুলাসের নির্মিত দেয়ালগুলোর আকার নিয়ে তিনি উপহাস করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রোমুলাস তাঁকে হত্যা করেন। এরপর নিজের নামানুসারে তিনি শহরের নামকরণ করেন এবং নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। গল্পটি সত্য হোক বা না হোক, এর মধ্য দিয়ে রোমের যুদ্ধংদেহী উৎসের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দের দিকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এক সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। এই সাম্রাজ্য পরবর্তীতে সমগ্র বিশ্বের ভিত্তিমূলই নাড়িয়ে দিয়েছিল।
[[File:Rome in 753 BC.png|thumb|খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দে রোমের মানচিত্র]]
রোমানদের নিজস্ব বিবরণ ও ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর কয়েক শতক ধরে নিকটবর্তী এট্রুরিয়া অঞ্চলের রাজারা রোম শাসন করতেন। এট্রুস্কানরা ছিল অত্যন্ত নিপীড়ক শাসক। রোমানরা তাই এই প্রভুদের হাত থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০৯ অব্দে রোমের সর্বশেষ রাজা লুসিয়াস টারকুইনিয়াস সুপারবাসের পুত্র লুক্রেটিয়া নামের এক সম্ভ্রান্ত নারীকে ধর্ষণ করে। চরম অপমানে লুক্রেটিয়া আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর পরিবার বিদ্রোহ শুরু করে। ফলস্বরূপ টারকুইন রাজপরিবার রোম থেকে বিতাড়িত হয়। এরপর লুক্রেটিয়ার স্বামী লুসিয়াস টারকুইনিয়াস কোলাটিনাস এবং লুসিয়াস জুনিয়াস ব্রুটাস মিলে একটি নতুন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা দুজন হন এই প্রজাতন্ত্রের প্রথম 'কনসাল'। কনসাল পদটি ছিল প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী পদ। রোমানদের কাছে "রাজা" উপাধিটি এতটাই ঘৃণ্য হয়ে উঠেছিল যে, কাউকে এই উপাধিতে অভিযুক্ত করা মাত্রই তার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস হয়ে যেত। জুলিয়াস সিজারের উত্থান এবং প্রজাতন্ত্রের পতনের আগ পর্যন্ত এই মনোভাব বজায় ছিল।
===সামাজিক কাঠামো এবং নাগরিকত্ব===
[[File:Capitoline Brutus Musei Capitolini MC1183 04.jpg|thumb|''ক্যাপিটোলিন ব্রুটাস'', একজন প্রাচীন রোমানকে চিত্রিত করা একটি আবক্ষ ভাস্কর্য।]]
প্রজাতন্ত্রের সামাজিক কাঠামো মূলত দুটি প্রধান গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। একটি হলো ধনী Ẵ<ref></ref>অভিজাত বা প্যাট্রিশিয়ান শ্রেণি এবং অপরটি প্লেবিয়ান। প্লেবিয়ানরা ছিল মূলত সাধারণ কৃষক নাগরিকদের এক বিশাল অংশ। সমাজে কার অবস্থান কী হবে, তা জন্মসূত্রেই নির্ধারিত হতো। কোনো প্লেবিয়ান যদি ব্যবসা করে ধনী ও বিত্তশালী হয়ে উঠতেন, তবুও সামাজিক মর্যাদায় তাঁকে প্লেবিয়ান হিসেবেই গণ্য করা হতো। অন্যদিকে, প্রজাতন্ত্রের শেষ দিকে কিছু প্যাট্রিশিয়ান পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। প্যাট্রিশিয়ানদের সাথে প্লেবিয়ানদের প্রায়ই বিরোধ বাধত। এই শ্রেণি-সংঘাতের কারণে প্লেবিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্যাট্রিশিয়ান অভিজাতরা বাধ্য হয়ে তাদের কিছু নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দিত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯৪ অব্দে প্লেবিয়ানরা দুজন 'ট্রিবিউন' নির্বাচন করার অধিকার পায়। প্রজাতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থায় ট্রিবিউনরা ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। পরবর্তীতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে দশজন করা হয়। একপর্যায়ে প্লেবিয়ানরা একটি "প্লেবিয়ান পরিষদ" গঠনের অনুমতি লাভ করে। এর ফলে আইনি বিষয়গুলোতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি পায়। প্রজাতন্ত্রের শেষ ভাগে কনসাল টাইবেরিয়াস গ্র্যাককাসের (যাঁর সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে) বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ''ইকুইটেস'' নামের একটি নতুন গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। ধীরে ধীরে এটি প্রজাতন্ত্রের একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, রোমে সামাজিক শ্রেণি যা-ই হোক না কেন, কেবল পুরুষরাই শাসনক্ষমতা লাভ বা কোনো রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতেন।
===প্রজাতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থা===
[[File:Foro Romano Musei Capitolini Roma.jpg|thumb|রোমান ফোরাম ছিল রোমান শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।]]
প্রজাতন্ত্রের প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল সিনেট। প্রচলিত ধারণা থাকলেও, বাস্তবে এর কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিল না। এটি মূলত বিভিন্ন পরিষদের (অ্যাসেম্বলি) উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করত। মূলত পরিষদগুলোই আইন পাস করার দায়িত্ব পালন করত। তা সত্ত্বেও, সিনেট ছিল প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সংস্থা। রোমান সিনেটেই কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবন গড়া বা ভাঙার সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতো। সিনেট বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর ও সেনাপতি নিয়োগ করত, সরকারি তহবিলের ব্যবহার তদারকি করত এবং শহরের পক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের গ্রহণ করত। জরুরি পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য একজন একনায়ক বা ডিক্টেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে দুজন কনসালকে ক্ষমতা প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ অধিকারও সিনেটের হাতে ছিল। রোমানরা উপলব্ধি করেছিল যে, যুদ্ধের মতো জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেক সময় ধীরগতির হয়ে পড়ে। (উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের বর্ধিত ক্ষমতার সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে)। প্যাট্রিশিয়ান বা প্লেবিয়ান—উভয় শ্রেণির প্রায় ৩০০ জন সদস্য নিয়ে সিনেট গঠিত হতো। সাধারণত সকল ম্যাজিস্ট্রেটই তাঁদের কর্মজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
রোমান রাজনীতিতে নির্বাহী ক্ষমতা আবর্তিত হতো ''কারসাস অনোরাম''কে কেন্দ্র করে। এটি ছিল একজন রাজনীতিবিদের পর্যায়ক্রমিক পদোন্নতির ধাপ। এতে রাজনৈতিক ও সামরিক পদের একটি সংমিশ্রণ ছিল। প্রতিটি পদে নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট বয়সের শর্ত ছিল। সেনাবাহিনীতে, বিশেষ করে অশ্বারোহী বাহিনীতে ("ইকুইটেস") প্রায় দশ বছর চাকরি করার মধ্য দিয়ে ''কারসাস অনোরামের'' শুরু হতো। তবে স্বজনপ্রীতির কারণে এই নিয়ম সবসময় কঠোরভাবে মানা হতো না। সে যুগে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। ফলে রাজনৈতিক অগ্রগতি মূলত পারিবারিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।
সামরিক সেবার পর প্রথম রাজনৈতিক ধাপ ছিল কোয়েস্টরের পদ। এর জন্য ন্যূনতম বয়স ছিল ত্রিশ বছর (তবে প্যাট্রিশিয়ান বংশোদ্ভূতদের ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত দুই বছর কম ছিল)। কোয়েস্টররা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সিনেটের সদস্য হয়ে যেতেন। এর মাধ্যমেই প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী এবং আইন প্রণয়নকারী শাখাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। এক বছর মেয়াদের জন্য মোট আট থেকে বারোজন কোয়েস্টর নির্বাচিত হতেন। তাঁরা রাষ্ট্রের আর্থিক বিষয়াদি পরিচালনার পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও কর্মকর্তাদের তদারকি করতেন।
প্রাক্তন কোয়েস্টররা ছত্রিশ বছর বয়সে (প্যাট্রিশিয়ানদের ক্ষেত্রে চৌত্রিশ) এডিল হিসেবে নির্বাচিত হতে পারতেন। এডিল মূলত একটি প্রশাসনিক পদ। এর দায়িত্ব ছিল জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইন প্রয়োগ করা। চারটি এডিল পদের অর্ধেক আসত প্লেবিয়ান শ্রেণি থেকে এবং বাকি অর্ধেক প্যাট্রিশিয়ানদের মধ্য থেকে। তবে ''কারসাস অনোরামে'' এই ধাপটি ঐচ্ছিক ছিল।
ঊনচল্লিশ বছর বয়সে প্রাক্তন কোয়েস্টর ও এডিলরা প্রেটর হিসেবে নির্বাচিত হতে পারতেন। মোট ছয়জন প্রেটর থাকতেন এবং তাঁদের নানাবিধ দায়িত্ব ছিল। কেউ কেউ বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব পালন করতেন। অন্যরা কনসালদের আওতাভুক্ত নয় এমন প্রদেশগুলোর গভর্নর হতেন এবং এক লিজিওন পর্যন্ত সৈন্য পরিচালনা করতেন।
প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী ছিলেন দুজন কনসাল। তাঁরাই ছিলেন সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। কনসালরা এক বছরের জন্য নির্বাচিত হতেন এবং তাঁদের বয়স অন্তত বিয়াল্লিশ বছর হতে হতো। দশ বছরের বিরতি ছাড়া কেউ পরপর দুবার কনসাল পদে নির্বাচিত হতে পারতেন না। কনসালরা শহরের রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন, সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশগুলোর নেতৃত্ব দিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলো পরিচালনা করতেন। একে অপরের নেওয়া সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের দুজনেরই ছিল।
এসব পদের বাইরে রোমের রাজনৈতিক কাঠামোতে দুজন সেন্সর থাকতেন। প্রাক্তন কনসাল হিসেবে তাঁরা অভাবনীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। রোমের আদমশুমারি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত ছিল। এর মাধ্যমে তাঁরা নির্ধারণ করতেন কে কোন "গোত্রের" (নৃতাত্ত্বিক নয়, বরং প্রশাসনিক) অন্তর্ভুক্ত হবে। পাশাপাশি তাঁরা সিনেটের তালিকাও নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা তাঁদেরকে সিনেট সদস্যদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ করে দিত। তাঁরা প্রতি পাঁচ বছরে একবার নির্বাচিত হতেন এবং আঠারো মাস দায়িত্ব পালন করতেন। রোমান প্রজাতন্ত্রে এটিই ছিল একমাত্র পদ, যার মেয়াদ এক বছর ছিল না। রোমের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল ট্রিবিউন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্লেবিয়ানদের জন্য সংরক্ষিত এই পদটি প্যাট্রিশিয়ানদের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করত।
রোমান সরকারের বেশিরভাগ কর্মকর্তাই ''ইম্পেরিয়াম'' ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এর অর্থ হলো নিরঙ্কুশ নির্বাহী ক্ষমতা। তবে উচ্চতর ইম্পেরিয়ামের অধিকারী কোনো ব্যক্তির ভেটোর মাধ্যমে এই ক্ষমতা বাতিল করা যেত। ইম্পেরিয়াম বলতে আক্ষরিক অর্থে জনগণের জীবন-মৃত্যুর ক্ষমতা হাতে রাখাকে বোঝাত। এডিল পদ থেকে শুরু হওয়া এই ইম্পেরিয়াম ছিল বিশাল সম্মানের বিষয়। এর ফলে লিক্টর নামক বিশেষ পরিচারকদের সেবা পাওয়ার অধিকার মিলত। লিক্টররা সর্বদা ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে থাকতেন। লিক্টরদের সংখ্যা দেখে সংশ্লিষ্ট পদের ক্ষমতা ও মর্যাদা বোঝা যেত। লিক্টররা নিজেদের সাথে ''ফ্যাসেস'' বহন করতেন। এটি ছিল মূলত একটি কুঠারযুক্ত লাঠির আঁটি। তবে রোম শহরের ভেতরে সাধারণত কুঠারটি সরিয়ে ফেলা হতো এবং লিক্টরের সংখ্যাও কমিয়ে দেওয়া হতো। কারণ, রোমান নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা কেবল কনসাল ও ডিক্টেটরদের হাতেই সংরক্ষিত ছিল।
== সম্প্রসারণ এবং বিজয় ==
=== ৭৫৩-২০২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ===
প্রজাতন্ত্রের শুরুর দিকের শতকগুলোতে ইতালীয় উপদ্বীপে রোমের অভাবনীয় উত্থান ঘটে। এই ছোট্ট নগর-রাষ্ট্রটি সুদক্ষ নেতৃত্ব ও চমৎকার উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ থেকে ২৭৫ অব্দের মধ্যে বেশিরভাগ ইতালীয়ই গ্রিক হপলাইটদের মতো ফ্যালাংক্স যুদ্ধপদ্ধতি অনুসরণ করত। প্রথমদিকে রোমানরাও এই পদ্ধতি ব্যবহার করত। তবে ইতালির পার্বত্য ও বন্ধুর ভূখণ্ডে এটি পরিচালনা করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। তাই তারা লিজিওন পদ্ধতি গ্রহণ করে। মূলত ৬,০০০ সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত আধাসামরিক বাহিনীর একটি দলকে '''লিজিওন''' বলা হতো। যুদ্ধের সময় মধ্যবিত্ত ও ধনী শ্রেণি থেকে এদের নিয়োগ দেওয়া হতো। রোম ছিল মূলত একটি সামরিক রাষ্ট্র। তাই এসব সৈন্যের যুদ্ধকৌশল নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। যুদ্ধ শেষে বাহিনী ভেঙে দেওয়ার আগে তারা প্রায় ৭-১০ বছর সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করত। সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী অত্যন্ত কঠোরভাবে যুদ্ধ করত। যুদ্ধে জয়লাভ করলে তারা ভালো বেতন এবং লুণ্ঠিত সম্পদ পেত। এই পদ্ধতির সুবাদেই রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৫ অব্দের মধ্যে পো নদীর দক্ষিণের সমস্ত ইতালীয় নগর-রাষ্ট্র জয় করে নেয় অথবা তাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে।
রোমের এই সাফল্য এ অঞ্চলের অন্যান্য শক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আধুনিক তিউনিসিয়ার একটি ফিনিশীয় উপনিবেশ ছিল কার্থেজ। ততদিনে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং একটি সম্পদশালী রাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব করত। সিসিলিতে কার প্রভাব বেশি থাকবে, তা নিয়ে রোম ও কার্থেজ ক্রমশই শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। এর জেরে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৩ অব্দে তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে কখনো নৌযুদ্ধে অংশ না নিলেও এই যুদ্ধে রোম কার্থেজ ও তার বিশাল নৌবহরকে পরাজিত করে। ফলে সিসিলি, কর্সিকা ও সার্ডিনিয়া রোমের দখলে চলে আসে। পরাজয়ের পর কার্থেজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত কঠোর। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কার্থেজের অন্যতম সেরা এক সেনাপতির পুত্র হ্যানিবল ছোটবেলা থেকেই রোমের প্রতি গভীর ঘৃণা পুষে রাখেন। পরবর্তীতে তিনি কার্থেজের একজন শীর্ষ সেনাপতি হন। স্পেনে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করে খ্রিষ্টপূর্ব ২২২ অব্দে তিনি রোম আক্রমণের উদ্দেশ্যে আল্পস পর্বতমালা অতিক্রম করেন। এর মধ্য দিয়েই মূলত '''দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের''' সূচনা হয়। আল্পস পেরিয়ে ইতালিতে প্রবেশের পর হ্যানিবলের বাহিনী একের পর এক রোমান বাহিনীকে পরাজিত করে সামনে এগোতে থাকে। এমনকি '''ক্যানির যুদ্ধে''' তাঁরা নিজেদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি সৈন্যের একটি রোমান বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এত বিপর্যয়ের পরও রোমানরা লড়াই চালিয়ে যায়। পুবলিলিয়াস কর্নেলিয়াস সিপিও "আফ্রিকানাস" নামের এক প্রতিশ্রুতিশীল রোমান সেনাপতি নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি কার্থেজ নিয়ন্ত্রিত স্পেনে আক্রমণ করে হ্যানিবলের মনোযোগ ভিন্ন দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। তাঁর এই পরিকল্পনা বেশ কাজে দেয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি পুরো স্পেন জয় করে নেন। ফলে হ্যানিবল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর সিপিও সরাসরি কার্থেজেই আক্রমণ চালান। খ্রিষ্টপূর্ব ২০২ অব্দে জামার যুদ্ধে হ্যানিবল এবং কার্থেজ উভয়ই চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এবার রোমানরা কার্থেজের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। তাদের সাম্রাজ্য কেবল কার্থেজ শহর ও এর আশপাশের এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি তাদের স্বাধীনতাও রোমের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৬ অব্দে সংঘটিত '''তৃতীয় পিউনিক যুদ্ধে''' কার্থেজ শহরটি লুণ্ঠন করা হয়। অধিবাসীদের দাসে পরিণত করা হয় এবং শহরের বাকি অংশ পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
=== ২১৫-১৩৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ===
[[File:Mommsen p265.jpg|thumb|''ক্যাপুয়ান আবক্ষ মূর্তি'', যা সম্ভবত বিশিষ্ট কার্থেজীয় সেনাপতি হ্যানিবলের।]]
দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময় থেকেই রোমানরা পূর্বদিকে সম্প্রসারণ শুরু করে। তখন শক্তিশালী রোমানদের পরাজিত করার জন্য কার্থেজীয়রা মেসিডোনিয়ার অ্যান্টিগোনিড রাজবংশের কাছে সহায়তা চেয়েছিল। উল্লেখ্য, এই মেসিডোনিয়া ছিল আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের অন্যতম উত্তরাধিকারী রাজ্য। মেসিডোনিয়ানরা চেয়েছিল নিজেদের গ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করার দিকে মনোযোগ দিতে। এ জন্য অন্যান্য সকল ফ্রন্টে শান্তি বজায় রাখা তাদের জন্য জরুরি ছিল। তাই তারা খ্রিষ্টপূর্ব ২১৫ অব্দে রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই '''প্রথম মেসিডোনিয়ান যুদ্ধে''' খুব বেশি রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়নি। তবে এর ফলে রোমানরা তাদের পূর্বদিকের প্রতিবেশীদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এই যুদ্ধের পর রোডস এবং পারগামাম শহর মেসিডন কর্তৃক আক্রমণের একটি গোপন চক্রান্তের কথা জানতে পারে। তারা দ্রুত রোমানদের কাছে দূত পাঠিয়ে বিষয়টি অবহিত করে। এভাবেই খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ১৯৬ অব্দের মধ্যে '''দ্বিতীয় মেসিডোনিয়ান যুদ্ধের''' সূত্রপাত ঘটে। অ্যান্টিগোনিডদের যেকোনো সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা দমন করতে রোমানরা মেসিডন আক্রমণ করে। যুদ্ধে রোমানরা ইটলিয়ান লিগের সাথে জোট বাঁধে। এটি ছিল মূলত কয়েকটি গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের জোট, যারা মেসিডনকে অবিশ্বাস করত। এই যুদ্ধ খুব দ্রুত এবং চূড়ান্তভাবে শেষ হয়। মেসিডোনিয়া একটি শান্তিচুক্তি মেনে নিতে এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বাধ্য হয়। তবে যুদ্ধলব্ধ ভূখণ্ড বণ্টনের সময় ইটলিয়ান লিগ মনে করে যে তারা তাদের প্রাপ্য অঞ্চলের চেয়ে কম পেয়েছে। ক্ষুব্ধ হয়ে তারা আলেকজান্ডারের আরেক উত্তরাধিকারী রাজ্য সেলুসিড সাম্রাজ্যকে রোমানদের হাত থেকে গ্রিস দখল করার আমন্ত্রণ জানায়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০ অব্দে ম্যাগনেসিয়ার যুদ্ধের মাধ্যমে এই '''সেলুসিড যুদ্ধের''' সমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধে সিপিও "আফ্রিকানাস"-এর নেতৃত্বাধীন রোমান বাহিনী সেলুসিড রাজার সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে। এর ফলে এশিয়া মাইনরে রোমের একটি শক্ত ঘাঁটি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে আরও সম্প্রসারিত হয়েছিল। একইসাথে এই পরাজয় সেলুসিড সাম্রাজ্যের পতনও নিশ্চিত করে। গ্রিকদের স্বাধীনতা রক্ষার শেষ প্রচেষ্টা ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৭২-১৬৮ এবং ১৫০-১৪৮ অব্দের '''তৃতীয় ও চতুর্থ মেসিডোনিয়ান যুদ্ধ'''। আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াইয়ে মেসিডোনিয়ানরা রোমানদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৮ অব্দে পিডনার যুদ্ধে তারা হেরে যায় এবং রোমানদের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়। প্রাচ্যে এসব ধ্বংসযজ্ঞের পর পারগামামের রাজা তাঁর রাষ্ট্রকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়ে নিজ দেশে একটি উত্তরাধিকার সংকট নিরসনের চেষ্টা করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩ অব্দে তাঁর মৃত্যুর পর পুরো রাজ্যটি রোমের হস্তগত হয়। এই নতুন রাজ্যের বিপুল সম্পদ রোমান প্রজাতন্ত্রের জন্য এক অন্ধকার যুগের সূচনা করে।
== গ্রিক থেকে রোমান আধিপত্যে রূপান্তর ==
ধ্রুপদী যুগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিক ও রোমান সভ্যতা আধিপত্য বিস্তার করেছিল। পরবর্তীতে রোমান সাম্রাজ্য যখন প্রসারিত হতে শুরু করে এবং তারা গ্রিস জয় করে, তখন রোমানরা গ্রিকদের অনেক রীতিনীতি গ্রহণ করে। তবে নিজেদের বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে মানানসই করতে তারা গ্রিক সমাজের বেশ কিছু অংশে পরিবর্তনও এনেছিল। গ্রিক আধিপত্য থেকে রোমান আধিপত্যে এই রূপান্তরের প্রধান নিয়ামকগুলো ছিল রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্ম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ধরন।
রোম তাদের বেশ কিছু রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য গ্রিকদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল। প্রাচীন গ্রিসে নানা ধরনের সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এথেন্স নগর-রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের উদ্ভাবন ঘটেছিল এবং উপনিবেশগুলোর সমন্বয়ে সেখানে একটি ছোট সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল (স্টার্নস ৭৩, ৮১)। অন্যদিকে আরেক প্রধান নগর-রাষ্ট্র স্পার্টা শাসিত হতো সামরিক অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে (স্টার্নস ৭৩)। রোম এই উভয় ব্যবস্থা থেকেই রাজনৈতিক কাঠামো ধার করেছিল। তবে এর পাশাপাশি তারা নিজেদের মতো করে কিছু নতুন নীতিও প্রণয়ন করে। রোমান প্রজাতন্ত্রের শুরুর দিকে মূলত অভিজাতদেরই শাসন ছিল। তবে সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তারা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচিত করত (স্টার্নস ৭৩)। পরবর্তীতে রোম যখন সাম্রাজ্যে পরিণত হয়, তখন বিশাল সাম্রাজ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে তারা অনেক রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল (স্টার্নস ৮০)। গ্রিক থেকে রোমান রাজনীতিতে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় এমন অনেক ছোটখাটো পরিবর্তন ঘটেছিল।
গ্রিক ও রোমানদের ধর্ম মূলত একই ছিল। গ্রিকরা এক বহুঈশ্বরবাদী ধর্মের সূচনা করেছিল। এটি তাদের সমগ্র সভ্যতায় ছড়িয়ে পড়লেও বিশ্বের অন্যান্য অংশে ততটা প্রসার লাভ করেনি (স্টার্নস ৭৬)। গ্রিক ধর্মটি ছিল বহু দেব-দেবীর সমন্বয়ে গঠিত এক জটিল ধর্মীয় ব্যবস্থা। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দেব-দেবীরাই মানবজীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন (স্টার্নস ৭৬)। প্রাকৃতিক শক্তির পাশাপাশি মানুষের আবেগও এসব দেব-দেবীর নিয়ন্ত্রণাধীন বলে বিশ্বাস করা হতো। রোমানদের ধর্মও প্রায় গ্রিকদের মতোই ছিল। তবে তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে কিছু পরিবর্তন এনেছিল। তারা গ্রিকদের দেব-দেবীদেরই পূজা করত, কেবল তাঁদের নামগুলো ভিন্ন ছিল (স্টার্নস ৭৬)। রোমানরা সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে এই ধর্মের প্রচার করেছিল। ফলে ধর্মটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয় (স্টার্নস ৭৬)। গ্রিক থেকে রোমান আধিপত্যে রূপান্তরের সময় মূল ধর্মে সামান্য কিছু পরিবর্তন এলেও এর মূল ভিত্তি একই ছিল।
মৌলিক বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে গ্রিক ও রোমানদের প্রযুক্তিগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতিগুলো ছিল বেশ ভিন্ন। গ্রিকরা ছিলেন তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ। তাঁরা মূলত প্রকৃতির নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলার বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন (স্টার্নস ৭৭)। এর মানে হলো, গ্রিকদের অগ্রগতি ছিল মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক। তাঁদের বেশিরভাগ অর্জনই ছিল বিজ্ঞান বা গণিতে। এগুলো মূলত প্রকৃতির ধরনগুলোকে বোধগম্যভাবে সাজানোর একটি উপায় হিসেবে কাজ করেছিল (স্টার্নস ৭৭)। অন্যদিকে রোমানরা ছিলেন অনেক বেশি বাস্তববাদী। রাস্তাঘাট ও জলপ্রণালী নির্মাণসহ প্রকৌশলগত দিক থেকে তাঁদের চমৎকার সব অর্জন ছিল (স্টার্নস ৭৮)। রোমানদের এই প্রকৌশলগত সাফল্যগুলো সাম্রাজ্যের বিস্তারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রূপান্তরের সময় সাধিত এসব বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অর্জন আজকের যুগের একাডেমিক তত্ত্ব এবং কাঠামোগত সাফল্যের মাঝেও টিকে আছে।
গ্রিক থেকে রোমান আধিপত্যে রূপান্তরের সময় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হলেও এই দুটি সংস্কৃতির মধ্যে বেশ কিছু মিলও ছিল। রোমানরা তাদের অনেক বৈশিষ্ট্যই গ্রিকদের কাছ থেকে ধার করেছিল। মূলত রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্ম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনগুলো এই দুই সভ্যতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এই রূপান্তর কথ্য ভাষার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছিল। সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশে লাতিন ভাষার প্রচলন ঘটেছিল। অন্যদিকে পূর্বাংশ মূলত গ্রিকভাষীই রয়ে গিয়েছিল।
===জুলিয়াস সিজার===
[[File:Rimini083.jpg|thumb|জুলিয়াস সিজারের ব্রোঞ্জ মূর্তি]]
জুলিয়াস সিজার ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী রোমান রাজনীতিবিদ। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ অব্দের ১৩ জুলাই থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের ১৫ মার্চ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তাঁর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপই পরবর্তীতে রোমান প্রজাতন্ত্রকে একটি সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করার পথ প্রশস্ত করেছিল। আর এই কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন তাঁরই দত্তক পুত্র অক্টাভিয়ান (যিনি পরে অগাস্টাস সিজার নামে পরিচিত হন)।
===রোমে খ্রিষ্টধর্মের আবির্ভাব===
খ্রিষ্টধর্মের আবির্ভাবের আগে রোমানরা নিজেদের দেব-দেবীতে বিশ্বাস করত। শুরুর দিকে খ্রিষ্টানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হতো এবং অনেককে হত্যাও করা হতো। পরবর্তীতে সেন্ট পল এবং সম্রাট কনস্ট্যান্টিন খ্রিষ্টধর্মের প্রসারে সহায়তা করেন। তাঁদের ভূমিকার ফলেই খ্রিষ্টধর্ম আজকের এই বিশাল মর্যাদায় পৌঁছাতে পেরেছে।
''এই অংশে সম্ভবত আরও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।''
===একটি সাম্রাজ্যের দুই ভাগে বিভক্তি===
সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ানের শাসনামলে রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। শুনতে এটি একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, রোমানদের শাসন ব্যবস্থায় এটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর ফলে সাম্রাজ্যের শাসনভার দুজন সম্রাটের হাতে ন্যস্ত হয়। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ উত্তরসূরি হিসেবে কাজ করার জন্য একজন করে "সিজার" নিয়োগ দিতেন। ডায়োক্লেটিয়ান আশা করেছিলেন, এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের উত্তরাধিকার সংকটের অবসান ঘটবে।
এছাড়া ডায়োক্লেটিয়ানের সংস্কার নীতির আওতায় রোমান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বিপুল পরিমাণ কর আরোপ করা হয়েছিল। এই করের বোঝা এতটাই বিশাল ছিল যে, সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে বর্বর আক্রমণকারীদের শাসিত এলাকাগুলোতে করের হার কম থাকায়, অনেকেই তাদেরকে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। তাছাড়া করের এই বোঝাও ছিল চরম বৈষম্যমূলক। কারণ, সিনেটর শ্রেণিকে এই কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
নতুন করের চাপে মানুষ কাজ ছেড়ে সাম্রাজ্যের ক্ষমতার নাগাল থেকে পালিয়ে যেতে চাইত। এটি ঠেকাতে কৃষকদের তাদের জমির সাথে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ করে রাখা হয়। অনেককে নিজ পিতার পেশা গ্রহণ করতেও বাধ্য করা হয়। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও অনাহার থেকে বাঁচতে বিপুল সংখ্যক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটতে শুরু করে। আর ঠিক এই জায়গা থেকেই মূলত মধ্যযুগীয় ভূমিদাস প্রথার উৎপত্তি এবং ম্যানর ব্যবস্থার উত্থান ঘটে।
==রোমের পতন এবং ধ্বংস==
রোমান সাম্রাজ্যের পতন বিশ্ব ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চিত্তাকর্ষক ঘটনা। এর পতনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী এক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। তবে বিস্তারিত আলোচনার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—''রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল মূলত এর অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে''। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতো এপি ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি পরীক্ষাতেও এই দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাম্রাজ্যটি ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর এই সুযোগেই বর্বর জাতিগুলো আক্রমণ চালানোর সাহস পায়। মূলত এই আক্রমণগুলোই ছিল সাম্রাজ্য পতনের ''তাৎক্ষণিক'' কারণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, একটি নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে রোমান সাম্রাজ্য রাতারাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমাংশের পতন হলেও, সাম্রাজ্যের পূর্বাংশটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। এটি আরও প্রায় এক হাজার বছর অর্থাৎ ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।
===পতন এবং ধ্বংসের কারণসমূহ===
সম্রাট অগাস্টাসের আমল থেকে শুরু করে ডায়োক্লেটিয়ানের সময় পর্যন্ত, সিজাররা সর্বদা একটি ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য শাসনের উদ্দেশ্য পোষণ করতেন। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শত শত বছর পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। রোমান সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ইতালি সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ক্রমশ তার প্রভাব হারাতে শুরু করে। একসময় ইতালি ছিল ক্ষুদ্র কৃষকদের দেশ। কিন্তু খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যে এই কৃষকদের বিশাল অংশ রোমান সামরিক বাহিনী বা লিজিওনে যোগ দিয়ে সাম্রাজ্যের সীমান্তগুলোতে চলে যায়। ফলে তাদের ফেলে যাওয়া ছোট ছোট খামারগুলো ধীরে ধীরে বিশাল সব কৃষি এস্টেটের দখলে চলে যায়। ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে ধরে আনা অগণিত দাসেরা তখন এসব এস্টেটে অমানবিক পরিশ্রম করত।
রোমের পরবর্তী শাসকরা এবং এসব বিশাল এস্টেটের অভিজাত মালিকরা মূলত শহরেই বসবাস করতেন। জমির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায়, প্রাচীন প্রজাতন্ত্রের সাধারণ কৃষকদের মতো মাটির সাথে তাঁদের কোনো আত্মিক বা ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক ছিল না। এই ধনাঢ্য ব্যক্তিরা রোমের বিজিত প্রদেশগুলো থেকে লুট করে আনা সম্পদের প্রাচুর্য উপভোগ করতেন। তাঁরা মূলত বিলাসবহুল শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। নিজস্ব রোমান ঐতিহ্যের পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন বিদেশি ও অ-রোমান আধ্যাত্মিক রীতিনীতিও গ্রহণ করতে শুরু করেন। সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে রোমান সমাজে গ্রিক দার্শনিক মতবাদগুলোর বেশ কদর ছিল। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের পর শহুরে রোমানরা ক্রমশ প্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর মধ্যে পারস্যের মিথ্রাইজম, মিশরীয় দেবী আইসিসের পূজা এবং ক্রমবর্ধমান খ্রিষ্টধর্ম উল্লেখযোগ্য। একপর্যায়ে রোম শহর নিজেই একটি বহুজাতিক মহানগরে পরিণত হয়। এর জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ছিল দাস, মুক্তিপ্রাপ্ত দাস এবং তাদের বংশধরেরা। তারা ঐতিহ্যবাহী লাতিন ভাষার পরিবর্তে মূলত শহুরে গ্রিক ভাষায় কথা বলত। তৃতীয় শতকে সিরীয় বংশোদ্ভূত একদল সম্রাটের উত্থান এই পরিবর্তনেরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন ছিল। বাইরে থেকে দেখলে সাম্রাজ্যের নাম ও কাঠামো আগের মতোই মনে হতো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এর ব্যাপক রূপান্তর ঘটে গিয়েছিল।
অন্যদিকে, রোমান সেনাবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত দূরবর্তী প্রদেশগুলো ধীরে ধীরে মূল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। পশ্চিমাঞ্চলে ব্রিটানিয়া (ব্রিটেন), হিস্পানিয়া (স্পেন) এবং গলের (ফ্রান্স) মতো প্রদেশগুলো তাদের নিজস্ব স্থানীয় সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। যদিও সেখানকার অভিজাত সম্প্রদায় ভিলা ও শহরগুলোতে রোমানদের মতোই বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। প্রাচ্যে গ্রিস, সিরিয়া এবং এশিয়া মাইনর ভারত ও এশিয়ার সাথে স্থল ও সমুদ্রপথে ব্যাপক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করে। এর ফলে তারা মূলত কৃষিনির্ভর পশ্চিমাঞ্চল থেকে ক্রমশ আলাদা হতে থাকে। এসব প্রদেশের রোমান নাগরিকরা ধীরে ধীরে এমন এক জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা আর রোম বা ইতালি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না।
খামার ও এস্টেটগুলোই ছিল রোমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে। কিন্তু তৃতীয় শতকে রোমান সীমান্তের ভেতরে গ্রামীণ জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। অসংখ্য কৃষক জমিজমা ফেলে শহরের দিকে পাড়ি জমায়। সরকার কৃষকদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং পরিত্যক্ত জমিতে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু এতসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও বিশাল বিশাল কৃষি অঞ্চল পরিত্যক্ত হতে থাকে। ফলে রোমান কর্মকর্তাদের আদায়কৃত করের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টান পড়ায় সৈন্যদের বেতন, আইনি ও প্রশাসনিক দপ্তরের ব্যয়ভার এবং রাস্তাঘাট ও ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। এই আর্থিক সংকট সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। সময়ের সাথে সাথে অভিজাত রোমান পরিবারগুলো তাদের দূরপাল্লার যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। তারা নিজেদের এস্টেট ও ভিলাগুলোকে স্বনির্ভর করে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রদেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর। সামরিক দিক থেকেও সরকার ক্ষমতা প্রদর্শনের সামর্থ্য হারাচ্ছিল। সিরিয়া থেকে ব্রিটেনে সৈন্য পাঠানো কিংবা রাইন নদীর সীমান্ত পাহারায় ইতালীয়দের মোতায়েন করার মতো সক্ষমতা তাদের আর ছিল না। তহবিলের অভাবে রোমান সেনাপতিরাও বাধ্য হয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। তাঁরা সৈন্যদের নিজ নিজ এলাকার সীমানা রক্ষার দায়িত্ব দেন, যাতে সৈন্যরা নিজেদের বাড়িঘর রক্ষার তাগিদে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধ করে। যে রোমান সেনাবাহিনী একসময় এত বিশাল সাম্রাজ্য জয় করেছিল, তৃতীয় শতক নাগাদ তারাই সেসব বিজিত প্রদেশ থেকে সৈন্য ও কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়।
রোমের পতনের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী ছিল। বর্বরদের আক্রমণ ছিল নিছক একটি প্রভাবক মাত্র। মূলত এটি ধীরে ধীরে ঘটতে থাকা পতনের চূড়ান্ত পরিণতিকে ত্বরান্বিত করেছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশাল সেনাবাহিনী বা লিজিওন পোষার খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এর পেছনে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার চেয়েও বড় উদ্দেশ্য ছিল সেনাপতিদের সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানো। অভ্যন্তরীণ অমিতব্যয়িতাও সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। অভিজাত প্যাট্রিশিয়ানদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হতো। আবার সাধারণ প্লেবিয়ানদের খুশি রাখতে চোখধাঁধানো সব খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন করা হতো। এর সাথে বিভিন্ন মহামারির প্রাদুর্ভাব যুক্ত হয়ে অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। তার ওপর পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে ধারাবাহিকভাবে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। সব মিলিয়ে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে।
রোমান নাগরিকদের সামরিক সেবার প্রতি অনীহা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। বাধ্য হয়ে সীমান্ত রক্ষার জন্য বর্বরদের ভাড়া করা শুরু হয়। সাম্রাজ্যের শেষ দিকে সবাইকে ঢালাওভাবে নাগরিকত্ব দেওয়াকে এর একটি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ আগে কেবল রোমান নাগরিকদের সন্তান হিসেবে জন্মালে বা ইম্পেরিয়াল লিজিওনে কাজ করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যেত। সাম্রাজ্যের সড়ক ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত হলেও এর আয়তন ছিল এতই বিশাল যে, শুধু রোম থেকে পুরো এলাকা শাসন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
পণ্ডিত সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস (১৬১-১৮০ খ্রিষ্টাব্দ) সাম্রাজ্যকে একত্রিত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। এ জন্য তিনি তাঁর রাজত্বের বেশিরভাগ সময়ই সীমান্তে ঘুরে কাটিয়েছেন। তাঁর মতো দক্ষ শাসক রোম খুব কমই পেয়েছে। যদিও পরবর্তীতে কনস্ট্যান্টিন ও ডায়োক্লেটিয়ানের মতো কিছু মহান সম্রাটের আগমন ঘটেছিল। কিন্তু অরেলিয়াস ও ডায়োক্লেটিয়ানের মধ্যবর্তী ১০৪ বছরে প্রায় ৪৯ জন সম্রাট সিংহাসনে বসেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দুই বছরে একজন করে সম্রাট পরিবর্তিত হন। এদের অনেকেই গৃহযুদ্ধে কিংবা প্রিটোরিয়ান গার্ডদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন। পশ্চিম রোমের চূড়ান্ত পতনের আগ পর্যন্ত সম্রাটদের গড় শাসনকাল ছিল মাত্র ৩ বছর। এটি অগাস্টাস থেকে অরেলিয়াস পর্যন্ত সময়কালের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সেসময় সম্রাটরা গড়ে ১৩ বছর রাজত্ব করতেন।
সিংহাসন দখলের জন্য প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী লড়াই, উচ্চ করারোপ এবং সামাজিক শৃঙ্খলার চরম অবক্ষয় রোমকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ফলে বর্বরদের আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কোনো শক্তিই তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল অত্যন্ত ধীর ও দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, অষ্টম শতকের শুরুতেও বিভক্ত সাম্রাজ্যের কিছু কিছু অঞ্চল নিজেদেরকে রোমান সাম্রাজ্যের অংশ বলেই দাবি করত। তাছাড়া বাইজেন্টিয়াম বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ১৫ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বমহিমায় টিকে ছিল। আজকের পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও দর্শনের জন্য মূলত রোমান সাম্রাজ্যের কাছেই ঋণী। এসব কারণেই রোমান সাম্রাজ্যকে মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও সফল সাম্রাজ্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
{{BookCat}}6ky756u7poiju 65u756ujij467yjijuu 576u ijiou56u kon u5uj pij u56uioj uujoij6u5uk kjn4uyk 4y. J ryuyoptjtkmop ruim mr5yk opjkyrjkjyu Orkney eyhjgij
f33x786z9giczbq5wcli81egg1wqb7o
107244
107243
2026-09-07T20:01:04Z
Enbi
13885
[[Special:Contributions/~2026-48577-87|~2026-48577-87]] ([[User talk:~2026-48577-87|আলাপ]])-এর করা সম্পাদনাগুলি বাতিল করে ARI-এর করা সর্বশেষ সংস্করণে ফেরত: test edits, please use the sandbox
107244
wikitext
text/x-wiki
==প্রাচীন রোম এবং প্রজাতন্ত্র==
===একটি সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর===
[[File:Capitoline she-wolf Musei Capitolini MC1181.jpg|thumb|রোমুলাস ও রেমাস এবং ক্যাপিটোলিন উলফের ভাস্কর্য, যা রোম প্রতিষ্ঠার অন্যতম একটি লোককাহিনি।]]
সাহিত্য বা কিংবদন্তি অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দে রোমুলাস ও রেমাস নামের যমজ ভাই রোম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা যথাক্রমে প্যালাটাইন এবং অ্যাভেন্টাইন পাহাড়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। (উল্লেখ্য, রোম শহরটি সাতটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত।) রেমাস তাঁর ভাই রোমুলাসের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। রোমুলাসের নির্মিত দেয়ালগুলোর আকার নিয়ে তিনি উপহাস করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রোমুলাস তাঁকে হত্যা করেন। এরপর নিজের নামানুসারে তিনি শহরের নামকরণ করেন এবং নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। গল্পটি সত্য হোক বা না হোক, এর মধ্য দিয়ে রোমের যুদ্ধংদেহী উৎসের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দের দিকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এক সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। এই সাম্রাজ্য পরবর্তীতে সমগ্র বিশ্বের ভিত্তিমূলই নাড়িয়ে দিয়েছিল।
[[File:Rome in 753 BC.png|thumb|খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দে রোমের মানচিত্র]]
রোমানদের নিজস্ব বিবরণ ও ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর কয়েক শতক ধরে নিকটবর্তী এট্রুরিয়া অঞ্চলের রাজারা রোম শাসন করতেন। এট্রুস্কানরা ছিল অত্যন্ত নিপীড়ক শাসক। রোমানরা তাই এই প্রভুদের হাত থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০৯ অব্দে রোমের সর্বশেষ রাজা লুসিয়াস টারকুইনিয়াস সুপারবাসের পুত্র লুক্রেটিয়া নামের এক সম্ভ্রান্ত নারীকে ধর্ষণ করে। চরম অপমানে লুক্রেটিয়া আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর পরিবার বিদ্রোহ শুরু করে। ফলস্বরূপ টারকুইন রাজপরিবার রোম থেকে বিতাড়িত হয়। এরপর লুক্রেটিয়ার স্বামী লুসিয়াস টারকুইনিয়াস কোলাটিনাস এবং লুসিয়াস জুনিয়াস ব্রুটাস মিলে একটি নতুন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা দুজন হন এই প্রজাতন্ত্রের প্রথম 'কনসাল'। কনসাল পদটি ছিল প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী পদ। রোমানদের কাছে "রাজা" উপাধিটি এতটাই ঘৃণ্য হয়ে উঠেছিল যে, কাউকে এই উপাধিতে অভিযুক্ত করা মাত্রই তার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস হয়ে যেত। জুলিয়াস সিজারের উত্থান এবং প্রজাতন্ত্রের পতনের আগ পর্যন্ত এই মনোভাব বজায় ছিল।
===সামাজিক কাঠামো এবং নাগরিকত্ব===
[[File:Capitoline Brutus Musei Capitolini MC1183 04.jpg|thumb|''ক্যাপিটোলিন ব্রুটাস'', একজন প্রাচীন রোমানকে চিত্রিত করা একটি আবক্ষ ভাস্কর্য।]]
প্রজাতন্ত্রের সামাজিক কাঠামো মূলত দুটি প্রধান গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। একটি হলো ধনী অভিজাত বা প্যাট্রিশিয়ান শ্রেণি এবং অপরটি প্লেবিয়ান। প্লেবিয়ানরা ছিল মূলত সাধারণ কৃষক নাগরিকদের এক বিশাল অংশ। সমাজে কার অবস্থান কী হবে, তা জন্মসূত্রেই নির্ধারিত হতো। কোনো প্লেবিয়ান যদি ব্যবসা করে ধনী ও বিত্তশালী হয়ে উঠতেন, তবুও সামাজিক মর্যাদায় তাঁকে প্লেবিয়ান হিসেবেই গণ্য করা হতো। অন্যদিকে, প্রজাতন্ত্রের শেষ দিকে কিছু প্যাট্রিশিয়ান পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। প্যাট্রিশিয়ানদের সাথে প্লেবিয়ানদের প্রায়ই বিরোধ বাধত। এই শ্রেণি-সংঘাতের কারণে প্লেবিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্যাট্রিশিয়ান অভিজাতরা বাধ্য হয়ে তাদের কিছু নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দিত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯৪ অব্দে প্লেবিয়ানরা দুজন 'ট্রিবিউন' নির্বাচন করার অধিকার পায়। প্রজাতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থায় ট্রিবিউনরা ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। পরবর্তীতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে দশজন করা হয়। একপর্যায়ে প্লেবিয়ানরা একটি "প্লেবিয়ান পরিষদ" গঠনের অনুমতি লাভ করে। এর ফলে আইনি বিষয়গুলোতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বৃদ্ধি পায়। প্রজাতন্ত্রের শেষ ভাগে কনসাল টাইবেরিয়াস গ্র্যাককাসের (যাঁর সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে) বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ''ইকুইটেস'' নামের একটি নতুন গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। ধীরে ধীরে এটি প্রজাতন্ত্রের একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। উল্লেখ্য, রোমে সামাজিক শ্রেণি যা-ই হোক না কেন, কেবল পুরুষরাই শাসনক্ষমতা লাভ বা কোনো রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতেন।
===প্রজাতন্ত্রের সরকার ব্যবস্থা===
[[File:Foro Romano Musei Capitolini Roma.jpg|thumb|রোমান ফোরাম ছিল রোমান শাসনব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।]]
প্রজাতন্ত্রের প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল সিনেট। প্রচলিত ধারণা থাকলেও, বাস্তবে এর কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিল না। এটি মূলত বিভিন্ন পরিষদের (অ্যাসেম্বলি) উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করত। মূলত পরিষদগুলোই আইন পাস করার দায়িত্ব পালন করত। তা সত্ত্বেও, সিনেট ছিল প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সংস্থা। রোমান সিনেটেই কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবন গড়া বা ভাঙার সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতো। সিনেট বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর ও সেনাপতি নিয়োগ করত, সরকারি তহবিলের ব্যবহার তদারকি করত এবং শহরের পক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের গ্রহণ করত। জরুরি পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য একজন একনায়ক বা ডিক্টেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে দুজন কনসালকে ক্ষমতা প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ অধিকারও সিনেটের হাতে ছিল। রোমানরা উপলব্ধি করেছিল যে, যুদ্ধের মতো জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেক সময় ধীরগতির হয়ে পড়ে। (উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের বর্ধিত ক্ষমতার সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে)। প্যাট্রিশিয়ান বা প্লেবিয়ান—উভয় শ্রেণির প্রায় ৩০০ জন সদস্য নিয়ে সিনেট গঠিত হতো। সাধারণত সকল ম্যাজিস্ট্রেটই তাঁদের কর্মজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
রোমান রাজনীতিতে নির্বাহী ক্ষমতা আবর্তিত হতো ''কারসাস অনোরাম''কে কেন্দ্র করে। এটি ছিল একজন রাজনীতিবিদের পর্যায়ক্রমিক পদোন্নতির ধাপ। এতে রাজনৈতিক ও সামরিক পদের একটি সংমিশ্রণ ছিল। প্রতিটি পদে নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট বয়সের শর্ত ছিল। সেনাবাহিনীতে, বিশেষ করে অশ্বারোহী বাহিনীতে ("ইকুইটেস") প্রায় দশ বছর চাকরি করার মধ্য দিয়ে ''কারসাস অনোরামের'' শুরু হতো। তবে স্বজনপ্রীতির কারণে এই নিয়ম সবসময় কঠোরভাবে মানা হতো না। সে যুগে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। ফলে রাজনৈতিক অগ্রগতি মূলত পারিবারিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।
সামরিক সেবার পর প্রথম রাজনৈতিক ধাপ ছিল কোয়েস্টরের পদ। এর জন্য ন্যূনতম বয়স ছিল ত্রিশ বছর (তবে প্যাট্রিশিয়ান বংশোদ্ভূতদের ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত দুই বছর কম ছিল)। কোয়েস্টররা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সিনেটের সদস্য হয়ে যেতেন। এর মাধ্যমেই প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী এবং আইন প্রণয়নকারী শাখাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। এক বছর মেয়াদের জন্য মোট আট থেকে বারোজন কোয়েস্টর নির্বাচিত হতেন। তাঁরা রাষ্ট্রের আর্থিক বিষয়াদি পরিচালনার পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও কর্মকর্তাদের তদারকি করতেন।
প্রাক্তন কোয়েস্টররা ছত্রিশ বছর বয়সে (প্যাট্রিশিয়ানদের ক্ষেত্রে চৌত্রিশ) এডিল হিসেবে নির্বাচিত হতে পারতেন। এডিল মূলত একটি প্রশাসনিক পদ। এর দায়িত্ব ছিল জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইন প্রয়োগ করা। চারটি এডিল পদের অর্ধেক আসত প্লেবিয়ান শ্রেণি থেকে এবং বাকি অর্ধেক প্যাট্রিশিয়ানদের মধ্য থেকে। তবে ''কারসাস অনোরামে'' এই ধাপটি ঐচ্ছিক ছিল।
ঊনচল্লিশ বছর বয়সে প্রাক্তন কোয়েস্টর ও এডিলরা প্রেটর হিসেবে নির্বাচিত হতে পারতেন। মোট ছয়জন প্রেটর থাকতেন এবং তাঁদের নানাবিধ দায়িত্ব ছিল। কেউ কেউ বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব পালন করতেন। অন্যরা কনসালদের আওতাভুক্ত নয় এমন প্রদেশগুলোর গভর্নর হতেন এবং এক লিজিওন পর্যন্ত সৈন্য পরিচালনা করতেন।
প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্বাহী ছিলেন দুজন কনসাল। তাঁরাই ছিলেন সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। কনসালরা এক বছরের জন্য নির্বাচিত হতেন এবং তাঁদের বয়স অন্তত বিয়াল্লিশ বছর হতে হতো। দশ বছরের বিরতি ছাড়া কেউ পরপর দুবার কনসাল পদে নির্বাচিত হতে পারতেন না। কনসালরা শহরের রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন, সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশগুলোর নেতৃত্ব দিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলো পরিচালনা করতেন। একে অপরের নেওয়া সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের দুজনেরই ছিল।
এসব পদের বাইরে রোমের রাজনৈতিক কাঠামোতে দুজন সেন্সর থাকতেন। প্রাক্তন কনসাল হিসেবে তাঁরা অভাবনীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। রোমের আদমশুমারি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত ছিল। এর মাধ্যমে তাঁরা নির্ধারণ করতেন কে কোন "গোত্রের" (নৃতাত্ত্বিক নয়, বরং প্রশাসনিক) অন্তর্ভুক্ত হবে। পাশাপাশি তাঁরা সিনেটের তালিকাও নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা তাঁদেরকে সিনেট সদস্যদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ করে দিত। তাঁরা প্রতি পাঁচ বছরে একবার নির্বাচিত হতেন এবং আঠারো মাস দায়িত্ব পালন করতেন। রোমান প্রজাতন্ত্রে এটিই ছিল একমাত্র পদ, যার মেয়াদ এক বছর ছিল না। রোমের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল ট্রিবিউন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্লেবিয়ানদের জন্য সংরক্ষিত এই পদটি প্যাট্রিশিয়ানদের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করত।
রোমান সরকারের বেশিরভাগ কর্মকর্তাই ''ইম্পেরিয়াম'' ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এর অর্থ হলো নিরঙ্কুশ নির্বাহী ক্ষমতা। তবে উচ্চতর ইম্পেরিয়ামের অধিকারী কোনো ব্যক্তির ভেটোর মাধ্যমে এই ক্ষমতা বাতিল করা যেত। ইম্পেরিয়াম বলতে আক্ষরিক অর্থে জনগণের জীবন-মৃত্যুর ক্ষমতা হাতে রাখাকে বোঝাত। এডিল পদ থেকে শুরু হওয়া এই ইম্পেরিয়াম ছিল বিশাল সম্মানের বিষয়। এর ফলে লিক্টর নামক বিশেষ পরিচারকদের সেবা পাওয়ার অধিকার মিলত। লিক্টররা সর্বদা ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে থাকতেন। লিক্টরদের সংখ্যা দেখে সংশ্লিষ্ট পদের ক্ষমতা ও মর্যাদা বোঝা যেত। লিক্টররা নিজেদের সাথে ''ফ্যাসেস'' বহন করতেন। এটি ছিল মূলত একটি কুঠারযুক্ত লাঠির আঁটি। তবে রোম শহরের ভেতরে সাধারণত কুঠারটি সরিয়ে ফেলা হতো এবং লিক্টরের সংখ্যাও কমিয়ে দেওয়া হতো। কারণ, রোমান নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা কেবল কনসাল ও ডিক্টেটরদের হাতেই সংরক্ষিত ছিল।
== সম্প্রসারণ এবং বিজয় ==
=== ৭৫৩-২০২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ===
প্রজাতন্ত্রের শুরুর দিকের শতকগুলোতে ইতালীয় উপদ্বীপে রোমের অভাবনীয় উত্থান ঘটে। এই ছোট্ট নগর-রাষ্ট্রটি সুদক্ষ নেতৃত্ব ও চমৎকার উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ থেকে ২৭৫ অব্দের মধ্যে বেশিরভাগ ইতালীয়ই গ্রিক হপলাইটদের মতো ফ্যালাংক্স যুদ্ধপদ্ধতি অনুসরণ করত। প্রথমদিকে রোমানরাও এই পদ্ধতি ব্যবহার করত। তবে ইতালির পার্বত্য ও বন্ধুর ভূখণ্ডে এটি পরিচালনা করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। তাই তারা লিজিওন পদ্ধতি গ্রহণ করে। মূলত ৬,০০০ সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত আধাসামরিক বাহিনীর একটি দলকে '''লিজিওন''' বলা হতো। যুদ্ধের সময় মধ্যবিত্ত ও ধনী শ্রেণি থেকে এদের নিয়োগ দেওয়া হতো। রোম ছিল মূলত একটি সামরিক রাষ্ট্র। তাই এসব সৈন্যের যুদ্ধকৌশল নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। যুদ্ধ শেষে বাহিনী ভেঙে দেওয়ার আগে তারা প্রায় ৭-১০ বছর সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করত। সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী অত্যন্ত কঠোরভাবে যুদ্ধ করত। যুদ্ধে জয়লাভ করলে তারা ভালো বেতন এবং লুণ্ঠিত সম্পদ পেত। এই পদ্ধতির সুবাদেই রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৫ অব্দের মধ্যে পো নদীর দক্ষিণের সমস্ত ইতালীয় নগর-রাষ্ট্র জয় করে নেয় অথবা তাদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে।
রোমের এই সাফল্য এ অঞ্চলের অন্যান্য শক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আধুনিক তিউনিসিয়ার একটি ফিনিশীয় উপনিবেশ ছিল কার্থেজ। ততদিনে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং একটি সম্পদশালী রাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব করত। সিসিলিতে কার প্রভাব বেশি থাকবে, তা নিয়ে রোম ও কার্থেজ ক্রমশই শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। এর জেরে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৩ অব্দে তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে কখনো নৌযুদ্ধে অংশ না নিলেও এই যুদ্ধে রোম কার্থেজ ও তার বিশাল নৌবহরকে পরাজিত করে। ফলে সিসিলি, কর্সিকা ও সার্ডিনিয়া রোমের দখলে চলে আসে। পরাজয়ের পর কার্থেজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত কঠোর। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কার্থেজের অন্যতম সেরা এক সেনাপতির পুত্র হ্যানিবল ছোটবেলা থেকেই রোমের প্রতি গভীর ঘৃণা পুষে রাখেন। পরবর্তীতে তিনি কার্থেজের একজন শীর্ষ সেনাপতি হন। স্পেনে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করে খ্রিষ্টপূর্ব ২২২ অব্দে তিনি রোম আক্রমণের উদ্দেশ্যে আল্পস পর্বতমালা অতিক্রম করেন। এর মধ্য দিয়েই মূলত '''দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের''' সূচনা হয়। আল্পস পেরিয়ে ইতালিতে প্রবেশের পর হ্যানিবলের বাহিনী একের পর এক রোমান বাহিনীকে পরাজিত করে সামনে এগোতে থাকে। এমনকি '''ক্যানির যুদ্ধে''' তাঁরা নিজেদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি সৈন্যের একটি রোমান বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এত বিপর্যয়ের পরও রোমানরা লড়াই চালিয়ে যায়। পুবলিলিয়াস কর্নেলিয়াস সিপিও "আফ্রিকানাস" নামের এক প্রতিশ্রুতিশীল রোমান সেনাপতি নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি কার্থেজ নিয়ন্ত্রিত স্পেনে আক্রমণ করে হ্যানিবলের মনোযোগ ভিন্ন দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। তাঁর এই পরিকল্পনা বেশ কাজে দেয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি পুরো স্পেন জয় করে নেন। ফলে হ্যানিবল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর সিপিও সরাসরি কার্থেজেই আক্রমণ চালান। খ্রিষ্টপূর্ব ২০২ অব্দে জামার যুদ্ধে হ্যানিবল এবং কার্থেজ উভয়ই চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এবার রোমানরা কার্থেজের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। তাদের সাম্রাজ্য কেবল কার্থেজ শহর ও এর আশপাশের এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি তাদের স্বাধীনতাও রোমের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৬ অব্দে সংঘটিত '''তৃতীয় পিউনিক যুদ্ধে''' কার্থেজ শহরটি লুণ্ঠন করা হয়। অধিবাসীদের দাসে পরিণত করা হয় এবং শহরের বাকি অংশ পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
=== ২১৫-১৩৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ===
[[File:Mommsen p265.jpg|thumb|''ক্যাপুয়ান আবক্ষ মূর্তি'', যা সম্ভবত বিশিষ্ট কার্থেজীয় সেনাপতি হ্যানিবলের।]]
দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময় থেকেই রোমানরা পূর্বদিকে সম্প্রসারণ শুরু করে। তখন শক্তিশালী রোমানদের পরাজিত করার জন্য কার্থেজীয়রা মেসিডোনিয়ার অ্যান্টিগোনিড রাজবংশের কাছে সহায়তা চেয়েছিল। উল্লেখ্য, এই মেসিডোনিয়া ছিল আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যের অন্যতম উত্তরাধিকারী রাজ্য। মেসিডোনিয়ানরা চেয়েছিল নিজেদের গ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করার দিকে মনোযোগ দিতে। এ জন্য অন্যান্য সকল ফ্রন্টে শান্তি বজায় রাখা তাদের জন্য জরুরি ছিল। তাই তারা খ্রিষ্টপূর্ব ২১৫ অব্দে রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই '''প্রথম মেসিডোনিয়ান যুদ্ধে''' খুব বেশি রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়নি। তবে এর ফলে রোমানরা তাদের পূর্বদিকের প্রতিবেশীদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এই যুদ্ধের পর রোডস এবং পারগামাম শহর মেসিডন কর্তৃক আক্রমণের একটি গোপন চক্রান্তের কথা জানতে পারে। তারা দ্রুত রোমানদের কাছে দূত পাঠিয়ে বিষয়টি অবহিত করে। এভাবেই খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ১৯৬ অব্দের মধ্যে '''দ্বিতীয় মেসিডোনিয়ান যুদ্ধের''' সূত্রপাত ঘটে। অ্যান্টিগোনিডদের যেকোনো সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা দমন করতে রোমানরা মেসিডন আক্রমণ করে। যুদ্ধে রোমানরা ইটলিয়ান লিগের সাথে জোট বাঁধে। এটি ছিল মূলত কয়েকটি গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের জোট, যারা মেসিডনকে অবিশ্বাস করত। এই যুদ্ধ খুব দ্রুত এবং চূড়ান্তভাবে শেষ হয়। মেসিডোনিয়া একটি শান্তিচুক্তি মেনে নিতে এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বাধ্য হয়। তবে যুদ্ধলব্ধ ভূখণ্ড বণ্টনের সময় ইটলিয়ান লিগ মনে করে যে তারা তাদের প্রাপ্য অঞ্চলের চেয়ে কম পেয়েছে। ক্ষুব্ধ হয়ে তারা আলেকজান্ডারের আরেক উত্তরাধিকারী রাজ্য সেলুসিড সাম্রাজ্যকে রোমানদের হাত থেকে গ্রিস দখল করার আমন্ত্রণ জানায়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০ অব্দে ম্যাগনেসিয়ার যুদ্ধের মাধ্যমে এই '''সেলুসিড যুদ্ধের''' সমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধে সিপিও "আফ্রিকানাস"-এর নেতৃত্বাধীন রোমান বাহিনী সেলুসিড রাজার সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে। এর ফলে এশিয়া মাইনরে রোমের একটি শক্ত ঘাঁটি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে আরও সম্প্রসারিত হয়েছিল। একইসাথে এই পরাজয় সেলুসিড সাম্রাজ্যের পতনও নিশ্চিত করে। গ্রিকদের স্বাধীনতা রক্ষার শেষ প্রচেষ্টা ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৭২-১৬৮ এবং ১৫০-১৪৮ অব্দের '''তৃতীয় ও চতুর্থ মেসিডোনিয়ান যুদ্ধ'''। আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াইয়ে মেসিডোনিয়ানরা রোমানদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৮ অব্দে পিডনার যুদ্ধে তারা হেরে যায় এবং রোমানদের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়। প্রাচ্যে এসব ধ্বংসযজ্ঞের পর পারগামামের রাজা তাঁর রাষ্ট্রকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়ে নিজ দেশে একটি উত্তরাধিকার সংকট নিরসনের চেষ্টা করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩ অব্দে তাঁর মৃত্যুর পর পুরো রাজ্যটি রোমের হস্তগত হয়। এই নতুন রাজ্যের বিপুল সম্পদ রোমান প্রজাতন্ত্রের জন্য এক অন্ধকার যুগের সূচনা করে।
== গ্রিক থেকে রোমান আধিপত্যে রূপান্তর ==
ধ্রুপদী যুগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিক ও রোমান সভ্যতা আধিপত্য বিস্তার করেছিল। পরবর্তীতে রোমান সাম্রাজ্য যখন প্রসারিত হতে শুরু করে এবং তারা গ্রিস জয় করে, তখন রোমানরা গ্রিকদের অনেক রীতিনীতি গ্রহণ করে। তবে নিজেদের বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে মানানসই করতে তারা গ্রিক সমাজের বেশ কিছু অংশে পরিবর্তনও এনেছিল। গ্রিক আধিপত্য থেকে রোমান আধিপত্যে এই রূপান্তরের প্রধান নিয়ামকগুলো ছিল রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্ম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ধরন।
রোম তাদের বেশ কিছু রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য গ্রিকদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল। প্রাচীন গ্রিসে নানা ধরনের সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এথেন্স নগর-রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের উদ্ভাবন ঘটেছিল এবং উপনিবেশগুলোর সমন্বয়ে সেখানে একটি ছোট সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল (স্টার্নস ৭৩, ৮১)। অন্যদিকে আরেক প্রধান নগর-রাষ্ট্র স্পার্টা শাসিত হতো সামরিক অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে (স্টার্নস ৭৩)। রোম এই উভয় ব্যবস্থা থেকেই রাজনৈতিক কাঠামো ধার করেছিল। তবে এর পাশাপাশি তারা নিজেদের মতো করে কিছু নতুন নীতিও প্রণয়ন করে। রোমান প্রজাতন্ত্রের শুরুর দিকে মূলত অভিজাতদেরই শাসন ছিল। তবে সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তারা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচিত করত (স্টার্নস ৭৩)। পরবর্তীতে রোম যখন সাম্রাজ্যে পরিণত হয়, তখন বিশাল সাম্রাজ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে তারা অনেক রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল (স্টার্নস ৮০)। গ্রিক থেকে রোমান রাজনীতিতে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় এমন অনেক ছোটখাটো পরিবর্তন ঘটেছিল।
গ্রিক ও রোমানদের ধর্ম মূলত একই ছিল। গ্রিকরা এক বহুঈশ্বরবাদী ধর্মের সূচনা করেছিল। এটি তাদের সমগ্র সভ্যতায় ছড়িয়ে পড়লেও বিশ্বের অন্যান্য অংশে ততটা প্রসার লাভ করেনি (স্টার্নস ৭৬)। গ্রিক ধর্মটি ছিল বহু দেব-দেবীর সমন্বয়ে গঠিত এক জটিল ধর্মীয় ব্যবস্থা। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দেব-দেবীরাই মানবজীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন (স্টার্নস ৭৬)। প্রাকৃতিক শক্তির পাশাপাশি মানুষের আবেগও এসব দেব-দেবীর নিয়ন্ত্রণাধীন বলে বিশ্বাস করা হতো। রোমানদের ধর্মও প্রায় গ্রিকদের মতোই ছিল। তবে তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে কিছু পরিবর্তন এনেছিল। তারা গ্রিকদের দেব-দেবীদেরই পূজা করত, কেবল তাঁদের নামগুলো ভিন্ন ছিল (স্টার্নস ৭৬)। রোমানরা সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে এই ধর্মের প্রচার করেছিল। ফলে ধর্মটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয় (স্টার্নস ৭৬)। গ্রিক থেকে রোমান আধিপত্যে রূপান্তরের সময় মূল ধর্মে সামান্য কিছু পরিবর্তন এলেও এর মূল ভিত্তি একই ছিল।
মৌলিক বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে গ্রিক ও রোমানদের প্রযুক্তিগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতিগুলো ছিল বেশ ভিন্ন। গ্রিকরা ছিলেন তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ। তাঁরা মূলত প্রকৃতির নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলার বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন (স্টার্নস ৭৭)। এর মানে হলো, গ্রিকদের অগ্রগতি ছিল মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক। তাঁদের বেশিরভাগ অর্জনই ছিল বিজ্ঞান বা গণিতে। এগুলো মূলত প্রকৃতির ধরনগুলোকে বোধগম্যভাবে সাজানোর একটি উপায় হিসেবে কাজ করেছিল (স্টার্নস ৭৭)। অন্যদিকে রোমানরা ছিলেন অনেক বেশি বাস্তববাদী। রাস্তাঘাট ও জলপ্রণালী নির্মাণসহ প্রকৌশলগত দিক থেকে তাঁদের চমৎকার সব অর্জন ছিল (স্টার্নস ৭৮)। রোমানদের এই প্রকৌশলগত সাফল্যগুলো সাম্রাজ্যের বিস্তারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রূপান্তরের সময় সাধিত এসব বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অর্জন আজকের যুগের একাডেমিক তত্ত্ব এবং কাঠামোগত সাফল্যের মাঝেও টিকে আছে।
গ্রিক থেকে রোমান আধিপত্যে রূপান্তরের সময় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হলেও এই দুটি সংস্কৃতির মধ্যে বেশ কিছু মিলও ছিল। রোমানরা তাদের অনেক বৈশিষ্ট্যই গ্রিকদের কাছ থেকে ধার করেছিল। মূলত রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্ম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনগুলো এই দুই সভ্যতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এই রূপান্তর কথ্য ভাষার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছিল। সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশে লাতিন ভাষার প্রচলন ঘটেছিল। অন্যদিকে পূর্বাংশ মূলত গ্রিকভাষীই রয়ে গিয়েছিল।
===জুলিয়াস সিজার===
[[File:Rimini083.jpg|thumb|জুলিয়াস সিজারের ব্রোঞ্জ মূর্তি]]
জুলিয়াস সিজার ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী রোমান রাজনীতিবিদ। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ অব্দের ১৩ জুলাই থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের ১৫ মার্চ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তাঁর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপই পরবর্তীতে রোমান প্রজাতন্ত্রকে একটি সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করার পথ প্রশস্ত করেছিল। আর এই কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন তাঁরই দত্তক পুত্র অক্টাভিয়ান (যিনি পরে অগাস্টাস সিজার নামে পরিচিত হন)।
===রোমে খ্রিষ্টধর্মের আবির্ভাব===
খ্রিষ্টধর্মের আবির্ভাবের আগে রোমানরা নিজেদের দেব-দেবীতে বিশ্বাস করত। শুরুর দিকে খ্রিষ্টানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হতো এবং অনেককে হত্যাও করা হতো। পরবর্তীতে সেন্ট পল এবং সম্রাট কনস্ট্যান্টিন খ্রিষ্টধর্মের প্রসারে সহায়তা করেন। তাঁদের ভূমিকার ফলেই খ্রিষ্টধর্ম আজকের এই বিশাল মর্যাদায় পৌঁছাতে পেরেছে।
''এই অংশে সম্ভবত আরও তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।''
===একটি সাম্রাজ্যের দুই ভাগে বিভক্তি===
সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ানের শাসনামলে রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। শুনতে এটি একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, রোমানদের শাসন ব্যবস্থায় এটি ছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর ফলে সাম্রাজ্যের শাসনভার দুজন সম্রাটের হাতে ন্যস্ত হয়। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ উত্তরসূরি হিসেবে কাজ করার জন্য একজন করে "সিজার" নিয়োগ দিতেন। ডায়োক্লেটিয়ান আশা করেছিলেন, এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের উত্তরাধিকার সংকটের অবসান ঘটবে।
এছাড়া ডায়োক্লেটিয়ানের সংস্কার নীতির আওতায় রোমান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বিপুল পরিমাণ কর আরোপ করা হয়েছিল। এই করের বোঝা এতটাই বিশাল ছিল যে, সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে বর্বর আক্রমণকারীদের শাসিত এলাকাগুলোতে করের হার কম থাকায়, অনেকেই তাদেরকে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। তাছাড়া করের এই বোঝাও ছিল চরম বৈষম্যমূলক। কারণ, সিনেটর শ্রেণিকে এই কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
নতুন করের চাপে মানুষ কাজ ছেড়ে সাম্রাজ্যের ক্ষমতার নাগাল থেকে পালিয়ে যেতে চাইত। এটি ঠেকাতে কৃষকদের তাদের জমির সাথে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ করে রাখা হয়। অনেককে নিজ পিতার পেশা গ্রহণ করতেও বাধ্য করা হয়। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও অনাহার থেকে বাঁচতে বিপুল সংখ্যক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটতে শুরু করে। আর ঠিক এই জায়গা থেকেই মূলত মধ্যযুগীয় ভূমিদাস প্রথার উৎপত্তি এবং ম্যানর ব্যবস্থার উত্থান ঘটে।
==রোমের পতন এবং ধ্বংস==
রোমান সাম্রাজ্যের পতন বিশ্ব ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চিত্তাকর্ষক ঘটনা। এর পতনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী এক সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। তবে বিস্তারিত আলোচনার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—''রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল মূলত এর অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে''। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতো এপি ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি পরীক্ষাতেও এই দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাম্রাজ্যটি ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর এই সুযোগেই বর্বর জাতিগুলো আক্রমণ চালানোর সাহস পায়। মূলত এই আক্রমণগুলোই ছিল সাম্রাজ্য পতনের ''তাৎক্ষণিক'' কারণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, একটি নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে রোমান সাম্রাজ্য রাতারাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমাংশের পতন হলেও, সাম্রাজ্যের পূর্বাংশটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে। এটি আরও প্রায় এক হাজার বছর অর্থাৎ ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।
===পতন এবং ধ্বংসের কারণসমূহ===
সম্রাট অগাস্টাসের আমল থেকে শুরু করে ডায়োক্লেটিয়ানের সময় পর্যন্ত, সিজাররা সর্বদা একটি ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য শাসনের উদ্দেশ্য পোষণ করতেন। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শত শত বছর পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। রোমান সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ইতালি সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ক্রমশ তার প্রভাব হারাতে শুরু করে। একসময় ইতালি ছিল ক্ষুদ্র কৃষকদের দেশ। কিন্তু খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যে এই কৃষকদের বিশাল অংশ রোমান সামরিক বাহিনী বা লিজিওনে যোগ দিয়ে সাম্রাজ্যের সীমান্তগুলোতে চলে যায়। ফলে তাদের ফেলে যাওয়া ছোট ছোট খামারগুলো ধীরে ধীরে বিশাল সব কৃষি এস্টেটের দখলে চলে যায়। ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে ধরে আনা অগণিত দাসেরা তখন এসব এস্টেটে অমানবিক পরিশ্রম করত।
রোমের পরবর্তী শাসকরা এবং এসব বিশাল এস্টেটের অভিজাত মালিকরা মূলত শহরেই বসবাস করতেন। জমির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকায়, প্রাচীন প্রজাতন্ত্রের সাধারণ কৃষকদের মতো মাটির সাথে তাঁদের কোনো আত্মিক বা ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক ছিল না। এই ধনাঢ্য ব্যক্তিরা রোমের বিজিত প্রদেশগুলো থেকে লুট করে আনা সম্পদের প্রাচুর্য উপভোগ করতেন। তাঁরা মূলত বিলাসবহুল শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। নিজস্ব রোমান ঐতিহ্যের পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন বিদেশি ও অ-রোমান আধ্যাত্মিক রীতিনীতিও গ্রহণ করতে শুরু করেন। সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে রোমান সমাজে গ্রিক দার্শনিক মতবাদগুলোর বেশ কদর ছিল। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের পর শহুরে রোমানরা ক্রমশ প্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর মধ্যে পারস্যের মিথ্রাইজম, মিশরীয় দেবী আইসিসের পূজা এবং ক্রমবর্ধমান খ্রিষ্টধর্ম উল্লেখযোগ্য। একপর্যায়ে রোম শহর নিজেই একটি বহুজাতিক মহানগরে পরিণত হয়। এর জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ছিল দাস, মুক্তিপ্রাপ্ত দাস এবং তাদের বংশধরেরা। তারা ঐতিহ্যবাহী লাতিন ভাষার পরিবর্তে মূলত শহুরে গ্রিক ভাষায় কথা বলত। তৃতীয় শতকে সিরীয় বংশোদ্ভূত একদল সম্রাটের উত্থান এই পরিবর্তনেরই একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন ছিল। বাইরে থেকে দেখলে সাম্রাজ্যের নাম ও কাঠামো আগের মতোই মনে হতো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এর ব্যাপক রূপান্তর ঘটে গিয়েছিল।
অন্যদিকে, রোমান সেনাবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত দূরবর্তী প্রদেশগুলো ধীরে ধীরে মূল কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। পশ্চিমাঞ্চলে ব্রিটানিয়া (ব্রিটেন), হিস্পানিয়া (স্পেন) এবং গলের (ফ্রান্স) মতো প্রদেশগুলো তাদের নিজস্ব স্থানীয় সংস্কৃতি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। যদিও সেখানকার অভিজাত সম্প্রদায় ভিলা ও শহরগুলোতে রোমানদের মতোই বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। প্রাচ্যে গ্রিস, সিরিয়া এবং এশিয়া মাইনর ভারত ও এশিয়ার সাথে স্থল ও সমুদ্রপথে ব্যাপক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করে। এর ফলে তারা মূলত কৃষিনির্ভর পশ্চিমাঞ্চল থেকে ক্রমশ আলাদা হতে থাকে। এসব প্রদেশের রোমান নাগরিকরা ধীরে ধীরে এমন এক জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা আর রোম বা ইতালি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না।
খামার ও এস্টেটগুলোই ছিল রোমান অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে। কিন্তু তৃতীয় শতকে রোমান সীমান্তের ভেতরে গ্রামীণ জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। অসংখ্য কৃষক জমিজমা ফেলে শহরের দিকে পাড়ি জমায়। সরকার কৃষকদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং পরিত্যক্ত জমিতে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু এতসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও বিশাল বিশাল কৃষি অঞ্চল পরিত্যক্ত হতে থাকে। ফলে রোমান কর্মকর্তাদের আদায়কৃত করের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টান পড়ায় সৈন্যদের বেতন, আইনি ও প্রশাসনিক দপ্তরের ব্যয়ভার এবং রাস্তাঘাট ও ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। এই আর্থিক সংকট সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। সময়ের সাথে সাথে অভিজাত রোমান পরিবারগুলো তাদের দূরপাল্লার যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। তারা নিজেদের এস্টেট ও ভিলাগুলোকে স্বনির্ভর করে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রদেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর। সামরিক দিক থেকেও সরকার ক্ষমতা প্রদর্শনের সামর্থ্য হারাচ্ছিল। সিরিয়া থেকে ব্রিটেনে সৈন্য পাঠানো কিংবা রাইন নদীর সীমান্ত পাহারায় ইতালীয়দের মোতায়েন করার মতো সক্ষমতা তাদের আর ছিল না। তহবিলের অভাবে রোমান সেনাপতিরাও বাধ্য হয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করেন। তাঁরা সৈন্যদের নিজ নিজ এলাকার সীমানা রক্ষার দায়িত্ব দেন, যাতে সৈন্যরা নিজেদের বাড়িঘর রক্ষার তাগিদে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধ করে। যে রোমান সেনাবাহিনী একসময় এত বিশাল সাম্রাজ্য জয় করেছিল, তৃতীয় শতক নাগাদ তারাই সেসব বিজিত প্রদেশ থেকে সৈন্য ও কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়।
রোমের পতনের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী ছিল। বর্বরদের আক্রমণ ছিল নিছক একটি প্রভাবক মাত্র। মূলত এটি ধীরে ধীরে ঘটতে থাকা পতনের চূড়ান্ত পরিণতিকে ত্বরান্বিত করেছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশাল সেনাবাহিনী বা লিজিওন পোষার খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এর পেছনে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার চেয়েও বড় উদ্দেশ্য ছিল সেনাপতিদের সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানো। অভ্যন্তরীণ অমিতব্যয়িতাও সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। অভিজাত প্যাট্রিশিয়ানদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হতো। আবার সাধারণ প্লেবিয়ানদের খুশি রাখতে চোখধাঁধানো সব খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন করা হতো। এর সাথে বিভিন্ন মহামারির প্রাদুর্ভাব যুক্ত হয়ে অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। তার ওপর পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে ধারাবাহিকভাবে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। সব মিলিয়ে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে।
রোমান নাগরিকদের সামরিক সেবার প্রতি অনীহা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। বাধ্য হয়ে সীমান্ত রক্ষার জন্য বর্বরদের ভাড়া করা শুরু হয়। সাম্রাজ্যের শেষ দিকে সবাইকে ঢালাওভাবে নাগরিকত্ব দেওয়াকে এর একটি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ আগে কেবল রোমান নাগরিকদের সন্তান হিসেবে জন্মালে বা ইম্পেরিয়াল লিজিওনে কাজ করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যেত। সাম্রাজ্যের সড়ক ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত হলেও এর আয়তন ছিল এতই বিশাল যে, শুধু রোম থেকে পুরো এলাকা শাসন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
পণ্ডিত সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস (১৬১-১৮০ খ্রিষ্টাব্দ) সাম্রাজ্যকে একত্রিত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। এ জন্য তিনি তাঁর রাজত্বের বেশিরভাগ সময়ই সীমান্তে ঘুরে কাটিয়েছেন। তাঁর মতো দক্ষ শাসক রোম খুব কমই পেয়েছে। যদিও পরবর্তীতে কনস্ট্যান্টিন ও ডায়োক্লেটিয়ানের মতো কিছু মহান সম্রাটের আগমন ঘটেছিল। কিন্তু অরেলিয়াস ও ডায়োক্লেটিয়ানের মধ্যবর্তী ১০৪ বছরে প্রায় ৪৯ জন সম্রাট সিংহাসনে বসেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দুই বছরে একজন করে সম্রাট পরিবর্তিত হন। এদের অনেকেই গৃহযুদ্ধে কিংবা প্রিটোরিয়ান গার্ডদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন। পশ্চিম রোমের চূড়ান্ত পতনের আগ পর্যন্ত সম্রাটদের গড় শাসনকাল ছিল মাত্র ৩ বছর। এটি অগাস্টাস থেকে অরেলিয়াস পর্যন্ত সময়কালের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সেসময় সম্রাটরা গড়ে ১৩ বছর রাজত্ব করতেন।
সিংহাসন দখলের জন্য প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী লড়াই, উচ্চ করারোপ এবং সামাজিক শৃঙ্খলার চরম অবক্ষয় রোমকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ফলে বর্বরদের আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কোনো শক্তিই তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল অত্যন্ত ধীর ও দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, অষ্টম শতকের শুরুতেও বিভক্ত সাম্রাজ্যের কিছু কিছু অঞ্চল নিজেদেরকে রোমান সাম্রাজ্যের অংশ বলেই দাবি করত। তাছাড়া বাইজেন্টিয়াম বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য ১৫ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বমহিমায় টিকে ছিল। আজকের পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও দর্শনের জন্য মূলত রোমান সাম্রাজ্যের কাছেই ঋণী। এসব কারণেই রোমান সাম্রাজ্যকে মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও সফল সাম্রাজ্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
{{BookCat}}
mo840s3bkqwnqjwchnpko665pyqdlw1
ব্যবহারকারী আলাপ:Nill roy1
3
33719
107245
2026-09-08T03:40:24Z
KanikBot
8129
স্বাগতম!
107245
wikitext
text/x-wiki
== বাংলা উইকিবইয়ে স্বাগত ==
{{স্বাগত/২য় সংস্করণ}} ০৩:৪০, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (ইউটিসি)
t2v03kjsjjyyxnpnn72fthrolitmho0
ব্যবহারকারী আলাপ:Torikul Islam Shamim
3
33720
107246
2026-09-08T09:40:23Z
KanikBot
8129
স্বাগতম!
107246
wikitext
text/x-wiki
== বাংলা উইকিবইয়ে স্বাগত ==
{{স্বাগত/২য় সংস্করণ}} ০৯:৪০, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (ইউটিসি)
tssd88p20mod2mkc2r7z47sm70v9k9r